“পদ্মাবতী” নিয়ে তোলপাড় এবং এক ছবি একাধিক জটিলতা

(Last Updated On: November 25, 2017)

সঞ্জয় লীলা বানসালীর তৈরি প্রায় ২০০ কোটি টাকার সিনেমার ভাগ্য এখন দেশের প্রধান শাসক দলের হাতে । মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর রাজ্যে সিনেমাটি দেখানোর প্রশ্নই ওঠে না ।

এই ঘোষণার পর হয়তো পদ্মাবতী নিষিদ্ধ হতে চলেছে ভারতবর্ষের সব রাজ্যে । যদিও ইতোমধ্যে সিনেমাটিকে প্রশংসাপত্রও দিয়েছে ব্রিটিশ বোর্ড অব ফিল্ম ক্লাসিফিকেশন (বিবিএফসি) ।

তবে ভারতীয় সেন্সর বোর্ডের প্রশংসাপত্র ছাড়া অন্য কোথাও সিনেমাটি মুক্তি দিতে চাইছেন না নির্মাতারা । এ প্রসঙ্গে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ভায়াকম ১৮-এর এক ঘনিষ্ঠসূত্র জানান, ভারতীয় সেন্সর বোর্ডের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত বিশ্বের কোনো দেশেই ‘পদ্মাবতী’ মুক্তি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নির্মাতারা শুধু তাই নয়, এই ছবির শুরু থেকেই বিভিন্ন জটিলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে ছবির পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালীকে । শুটিং সেটে সেট কর্মীর মৃত্যু, পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালীর লাঞ্ছিত হওয়া একাধিক অঘটন, সেটে উগ্রবাদী হামলা ইত্যাদি ।

সিনেমা একটি বিনোদনের মাধ্যম । কিন্তু এখন সেই সিনেমাই অনেকের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে । দীপিকা পাডুকোনের কথায় ধরা যাক । ছবিটিতে তিনি শুধুমাত্র অভিনয় করেছেন । পরিচালকের কথামতো অভিব্যক্ত দিয়েছেন । স্ক্রিপ্টে থাকা সংলাপগুলোই নির্মাতার নির্দেশে ক্যামেরার সামনে বলেছেন । এখন সেই দোষেই তার জীবন হুমকির মুখে ।

উগ্রবাদী নেতারা শুধু এই অভিনেত্রীকেই নয়, বরং তার পুরো পরিবারের প্রাণনাশের হুমকিও দিয়েছে । তাই এই অভিনেত্রীর পুরো পরিবারকেই দেওয়া হচ্ছে পুলিশি নিরাপত্তা । পাশাপাশি সঞ্জয়লীলা বানশালীকেও দেওয়া হচ্ছে প্রাণনাশের হুমকি । রানী পদ্মিনী অর্থাৎ পদ্মাবতীর আসল ইতিহাস । রানী পদ্মিনী ছিলেন সিংহলের রাজা গন্ধর্ব সেনের সুন্দরী কন্য পদ্মাবতী ।

সেইসময় মেবারের রাজধানী ছিল চিতোর বা চিতোরগড় । এই চিতোরের রাজা ছিলেন মহারানা রতন সিং। অন্যদিকে রাজকন্যা পদ্মিনীর রূপে গোটা দেশ ছিল মুগ্ধ । পদ্মিনীর বাবা গন্ধর্ব সেন এক বিরাট সয়ম্বর সভার আয়োজন করেন। সবাইকে টেক্কা দিয়ে রানী পদ্মিনীর বিয়ে হয় চিতোরের রাজা রাওয়াল রতন সিং এর সাথে । মহারাজা রতন সিং এর স্ত্রী ছিলেন এই রানী পদ্মিনী ।

এই রানী পদ্মিনীকে ডাকা হত পদ্মাবতী নামেও। রানী পদ্মিনী ছিলেন অপরূপ সুন্দরী । তাঁর সৌন্দর্যের খ্যাতি সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল । রাজপুতদের স্থানীয় লোকগাথা থেকে জানা যায় যে রানী পদ্মিনীরে রূপের কথা পৌঁছে যায় দিল্লীর দরবারে। তখন দিল্লীর দরবারে শাসন করছেন সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি । আলাউদ্দিন খিলজি ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে চিতোর আক্রমন করেন ।

শোনা যায় রানী পদ্মিনীর রূপের দর্শন এবং বন্দী করতেই নাকি আলাউদ্দিন খিলজি চিতোর আক্রমন করেন। প্রচন্ড পরাক্রমী আলাউদ্দিন খিলজির আক্রমন প্রতিহত করতে পারেনি রাজপুতরা । রতন সিংকে কারারুদ্ধ করেন সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি । এরপর আলাউদ্দিন খিলজি রানীর কাছে প্রস্তাব পাঠান যদি পদ্মিনী খিলজির সাথে দিল্লী যেতে রাজি হয় তাহলে রাণা রতন সিং কে ছেড়ে দেওয়া হবে।

এই গুরুগম্ভীর সময়ে রাজপুতরা কিছুটা চালাকি করে রাণা রতন সিং কে মুক্ত করেন। রাজপুতরা রানী এবং তাঁর পরিচারিকাদের পালকিতে করে রানীর বদলে কিছু সৈন্য পাঠিয়ে রাণা রতন সিং কে মুক্ত করে আনেন ।

এই ঘটনায় সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি খুবই খেপে যান । সুলতান খিলজি চিতোর ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন । তাঁর বিপুল সৈন্য নিয়ে দুর্গ ঘেরাও করেন । রাজপুতরা বীর হলেও খিলজির বিপুল সৈন্য বাহিনীর কাছে পেরে ওঠেনি । রাণা রতন সং রাজপুত সেনাদের নির্দেশ দেন শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে । ভয়ঙ্কর এই লড়াইয়ে বীর রাজপুত সেনাদের পরাজয় ঘটে ।

যুদ্ধে মারা যান মহারাণা রতন সিং। সুলতান খিলজি এবং তাঁর সেনাবাহিনী দুর্গের দরজা ভেঙে দুর্গের মধ্যে ঢুকে পড়েন রানী পদ্মিনীকে দখল করার জন্য । রানী পদ্মিনী বুঝতে পারেন আর কোনো উপায় নেই । তাঁর সামনে দুটি পথ খোলা আছে । একটি হল মৃত্যু এবং আর একটি হল সুলতান খিলজির কাছে নিজেকে সমর্পণ করে তাঁর সাথে দিল্লী যাওয়া ।

কিন্তু রাজপুত পুরুষদের মতোই রাজপুত মহিলারাও ছিলেন বীরাঙ্গনা । তখনকার দিনে অনেক রাজপুত নারীই নিজের সম্মান রক্ষার জন্য আত্মাহুতি দিতেন । রানী পদ্মিনী নিজের সম্মান রক্ষার জন্য জহর ব্রত পালনের মধ্য দিয়ে অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন । শুধুমাত্র রানী পদ্মিনী নন, এইভাবে নিজের সম্মান রক্ষার জন্য তখনকার দিনে অনেক রাজপুত মহিলাই এইভাবে আত্মহত্যা করতেন ।

রাজপুতরা যে কত বীর ছিলেন তা তাদের ইতিহাস ঘাঁটলেই জানা যায় । তাঁরা যেমন বীরের মতো বাঁচতেন, তেমনি তাদের সম্মান রক্ষার জন্য বীরের মতো প্রানও বিসর্জন দিতেন । ইতিহাস যাই বলুক না কেন রানী পদ্মিনী হলেন একজন মহীয়সী রাজপুত নারীর প্রতিনিধি ।

পদ্মাবতী ছবি

তাঁর চরিত্রের মাধমেই জানা যায় তখনকার রাজপুত নারীরা কেমন সাহসী ছিলেন । তাঁর চরিত্রের মধ্য দিয়ে তখনকার সমগ্র রাজপুত নারী চরিত্রের প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছে । উপরোক্ত ইতিহাস বিকৃতি আর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ এনে ভারতের ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতারা উত্তপ্ত করে রেখেছে পুরো দেশ । এখন অপেক্ষা শুধুমাত্র পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার । বিজয়ের আলো কি সিনেমার হবে, নাকি রাজনীতির – সেটাই দেখার বিষয় ।

Comments

People comments

1 thought on ““পদ্মাবতী” নিয়ে তোলপাড় এবং এক ছবি একাধিক জটিলতা

Leave a Comment